ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার আগে ভুল – পর্ব ৬

স্কিল থাকা সত্ত্বেও অনেকদিন পর্যন্ত কাজ না পাওয়া এবং কাজ না পেয়ে অজানা দিন গুনতে থাকা

ফাইবারের সৃষ্টির পর থেকেই এই একটি মহামারী সমস্যা সবার মধ্যে রয়ে গিয়েছে এখনো।


কারণ যত দিন যাচ্ছে তত বেশি কম্পিটিশন তৈরি হচ্ছে এবং অনেক সেলার ৬ থেকে ১ বছর শুধু বসেই থাকে একটি অর্ডার পাওয়ার জন্য।


অনেকেই হতাশায় থাকতে থাকতে ভাবে যে ফ্রীলান্সিং তার আর করা হবে না কারণ পরিবেশগত এবং ফ্যামিলিগত ঝামেলার কারণে তাকে চাকরি জোগান দিতে হয়। এতে করে দেখা যায় যে সে আর কখনোই ফ্রিল্যান্সিং করে বেড়ে উঠতে পারেনি।


তাই আজকে আমি এই বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করব যে কিভাবে আপনি ফ্রিল্যান্সিং স্কিল দিয়ে স্বয়ং সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরবেন।
১) প্রথম কথা হচ্ছে কিছুদিন আগে আমি কামরুজ্জামান ভাইয়ের একটা পোস্ট দেখেছিলাম সেখানে লিখা ছিল স্মার্ট গোল সম্পর্কে। এখন স্মার্ট গোল সম্পর্কে অনেকেই হয়তো বা জানেন না।
এখন বিস্তারিত জানার জন্য Golam Kamruzzaman পোস্টটি দেখে আসতে পারেন।
তো যে কথায় ছিলাম স্মার্ট গোল যদি আপনার মধ্যে না থাকে তাহলে আপনি কখনোই সাফল্য অর্জন করতে পারবেন না। এক কথায় আপনাকে খুবই নির্ধারিত এবং স্পেসিফিক একটি টার্গেট তৈরি করতে হবে যা দ্বারা আপনি নিজের লাইফ কে গড়ে তুলবেন।
যদি আপনার টার্গেট অথবা গোল না থাকে তাহলে আপনি কনফিডেন্ট পাবেন না আর যদি কনফিডেন্ট না থাকে তাহলে আপনি সবসময় হতাশায় ভুগবেন।
তাই জীবনের যেকোনো একটি বড় লক্ষ্য তৈরি করুন এবং সেই লক্ষ্যকে আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লক্ষ্যে ভেঙে ফেলুন তারপর সেই ক্ষুদ্র লক্ষ্য গুলো একটি একটি করে সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করুন।
দেখবেন সাফল্য অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে।
২) ফাইবার মার্কেটপ্লেস এ আমরা অনেকেই কাজ পাই না এটা আমাদের অনেক বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে মাঝেমধ্যে আমার নিজেরও এটি ফিল হয়।
এখন আপনি স্কিল ডেভেলপ করে যখন মার্কেটপ্লেস গুলোতে কাজ করতে চাইবেন তখন আপনি যে ভুলটি প্রথমেই করে থাকেন সেটা হচ্ছে নিজে যা পারেন ঠিক সেই কাজটি করার চেষ্টা করেন।
আমি জানি আপনি কথাটি বুঝতে পারেননি, মানে হচ্ছে আপনি যতটুকু শিখেছেন ঠিক ততটুকু মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা, প্রথমত আপনাকে যে কাজটি করতে হবে সেটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর এই কাজটি হচ্ছে আপনাকে বের করতে হবে যে আপনি যে সার্ভিসটি দিতে চাচ্ছেন সেই সার্ভিসের ক্লায়েন্টকে এবং ওই ক্লায়েন্টের চাহিদা টা কি।
ক্লায়েন্ট কখনও এটা ভাবে না যে আপনি কি পারেন, ক্লায়েন্ট সব সময় ভাবে যে আপনি তাকে কিভাবে সার্ভিস দিবেন।
তাই কাজ শুরু করার আগে প্রথম কাজ হচ্ছে আপনার এটা বোঝা যে কোন উপায়ে এবং কোন ক্লায়েন্টকে আপনি কি সার্ভিস দিবেন।
ধরুন আপনার ক্লায়েন্ট হচ্ছে মোটিভেশনাল স্পিকার, এখন মোটিভেশনাল স্পিকার এর দুই টাইপের লোগো থাকে একটি হচ্ছে তার বিজনেস লোগো আরেকটি হচ্ছে সিগনেচার লোগো।
তাহলে আপনি এখন জানেন যে মোটিভেশনাল স্পিকার এর কি কি টাইপের লোগো দরকার।
আপনাকে ঠিক এভাবে স্পেসিফিক সমস্যাগুলো বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি বা নিশ সম্পর্কে জানতে হবে এবং সেই সমস্যাগুলো লিস্ট করতে হবে।
তাতে করে খুব স্পেসিফিক্যালি আপনি জানতে পারবেন যে কোন সার্ভিসটি আপনি ফাইবারে গিগ হিসেবে তৈরি করেন তাহলে হাই কম্পিটিশন বাদ দিয়ে লো কম্পিটিশন গিগ তৈরি করতে পারবেন ।
৩) এখন আপনার মাথায় আসবে যে আমি শুধু একটি ক্লায়েন্ট নিয়ে কেন গিগ তৈরি করব আমি পারলে সবাইকে নিয়ে তৈরি করব। যাতে করে যে কেউ আমার গীগে অর্ডার করতে পারে।
বিভিন্ন টাইপের ক্লায়েন্টের সাথে যখন কথা বলতে যাবেন তখন বুঝতে পারবেন বিচিত্র টাইপের ক্লায়েন্ট রয়েছে আর এই বিচিত্র টাইপের ক্লায়েন্টরা আপনাকে যখন নক করবে তখন আপনি নিজেই পাগল হয়ে যাবেন।
যদি আপনি একটি স্পেসিফিক ক্লায়েন্টকে টার্গেট করেন তাহলে তার সম্পর্কে জানতে আপনার সবচেয়ে সহজ হবে এবং আপনি সহজেই তাকে বুঝাতে পারবেন আপনার যোগ্যতা এবং সে আপনার সাথে কথা বলে বা কনভারসেশন করে স্বচ্ছন্দ বোধ করবে।
জেনারালাইজ গিগ যদি তৈরি করেন তাহলে আপনার কম্পিটিশন অনেক বেশি হবে। এতে করে আপনার কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা একদমই কম থাকে।
জেনারালাইজ গিগ মানে হচ্ছে সবার জন্য যে সার্ভিস টা আপনি দিবেন যেমন I will design a logo for you
আমি স্পেসিফিক্যালি কাউকে নির্দেশ করে বলিনি যে আমি কার জন্য লোগো তৈরি করব, আমি ডিরেক্টলি লোগো ডিজাইন করে দিব বলেছি এবং এই লোগো ডিজাইন যে কারো জন্যই হতে পারে আর এটা হচ্ছে জেনারালাইজ গিগ।
যদি আপনি হাই কম্পিটিশন অলা গিগের সাথে কমপিট করে কাজ নিতে চান তাহলে আপনাকে 6 মাস এক বছর অথবা দুই বছর এভাবেই বসে থাকতে হবে।
তাই যতটুকু পারেন লো কম্পিটিশন গিগ গুলো খুজে বের করে সেগুলো তৈরি করার চেষ্টা করুন।

৪) আপনি একটি ক্লাইন্ট সম্পর্কে যত বেশি রিসার্চ করবেন তার প্রবলেমগুলো তত বেশি জানতে পারবেন এবং তার প্রবলেমগুলো সলিউশন দিতে পারবেন।
তাই সেই প্রবলেমগুলো লিস্ট করে ওগুলোর সাথে সম্পৃক্ত আপনার সার্ভিসের গিফট তৈরি করা শুরু করে দিন তাহলেই দেখবেন আপনি খুব সহজে কাজ পেয়ে যাচ্ছেন।
৫) আরেকটি ভুল হচ্ছে আমরা ফাইবারের সার্চ করা সম্পর্কে রিসার্চ না করে গিগ তৈরি করে ফেলি। নিজেও জানিনা যে ক্লায়েন্ট আসলে কি লিখে ফাইবারে সার্চ করে। যদি আপনি এটা উপলব্ধি করতে না পারেন যে ফাইবারে ক্লায়েন্ট কি লিখে সার্চ করে তাহলে আপনার সার্চ রেংকিং পাওয়াটা একটু দুর্লভ।
আপনাকে আগে বুঝতে হবে ক্লায়েন্ট কি টাইপ করে সার্চ করলে আপনাকে খুঁজে পাবে। অনেকেই অনেক টাইপের গিগ তৈরি করতে পারেন তখন সেই গিগ গুলো কোনটা কোন রেঙ্কিং আছে তা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে।
যখন আপনি কোন কীওয়ার্ড দিয়ে আপনার গিগ খুঁজে পাবেন তখন ওই কিওয়ার্ডের সার্চ করার পর একদম প্রথমেই দেখবেন কয়েকজন সেলার আছে যারা নিয়মিত কাজ পাচ্ছে। ওই সকল সেলারদের গত একমাসে কয়টি কাজ কমপ্লিট হয়েছে তা রিভিউ সেকশন থেকে দেখে নিন। তাছাড়া তাদের কিউই দেখে নিয়ে আপনাকে বুঝতে হবে যে তাদের কতগুলো অর্ডার রানিং আছে। যদি দেখেন এর পরিমাণ 5 থেকে 10 এর মতো তাহলে বুঝতে হবে এই ধরনের গিগ এর চাহিদা অনেক বেশি এবং এর যদি কম্পিটিশন কম থাকে তাহলে চট করে গিগ টি তৈরি করে ফেলুন।
আরেকটি ব্যাপার মনে রাখবেন প্রথম গিগ তৈরি করার সময় হাই লেভেল প্রাইস দিবেন না তাহলে কাজ না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কম্পিটিটরদের প্রাইস লেভেল চেক করে তার থেকে দ্বিগুন প্রাইস কম দেওয়ার চেষ্টা করুন তাতে করে ক্লায়েন্ট আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং আপনি সহজে কাজ পাবেন বলে আশা করি।
তবে যে কাজের মূল্য 100 ডলার সেটা আবার 5 ডলারে করে দিবেন না তাতে করে ভ্যালুটা নষ্ট হবে এবং অনেক সময় এ ধরনের কাজ করতে গেলে যদি পাঁচ ডলারের ক্লায়েন্ট করাতে চায় সেই ক্লায়েন্ট গুলো একটু বাজে ক্লায়েন্ট হয় যা আপনার প্রোফাইলের জন্য খুবই খারাপ হবে প্রথম দিকে।

সর্বশেষ কথা হচ্ছে আপনি যদি হাই কম্পিটিশন এবং লো ডিমান্ডেবল গিগ তৈরি করেন তাহলে আপনাকে বছরের-পর-বছর বসে থাকতে হবে।
আপনাকে প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে ক্লায়েন্টের সমস্যা কোথায় এবং সেই সমস্যার সলিউশন কিভাবে আপনি দিবেন আপনার সার্ভিস দ্বারা এবং সেই সমস্যা সে কত সহজে আপনার কাছ থেকে পেয়ে যাবে এই ব্যাপার গুলো যদি করতে পারেন তাহলেই আপনি ফাইবার কেনো যেকোনো মার্কেটপ্লেসে সাকসেসফুল হতে পারবেন।
এখন বলতে পারেন যে আমি উপরে যা বলেছি তা ছাড়াও অনেকেই কাজ পাচ্ছে কিন্তু আপনি পাচ্ছেন না এটাও সত্যি কথা।
যখন ফাইবার নতুন ছিল অনেকেরই কম্পিটিশন ছিলো না তাই অনেকেই জেনারালাইজ গিগ করে ও অনেক অনেক কাজ পেয়েছে কিন্তু যেহেতু এখন কম্পিটিশনের পরিমাণ বেশি তাই আপনাকে উপরের বুদ্ধিগুলো প্রয়োগ করেই কাজ করতে হবে।

ফাইবারে আমি প্রায় 7 বছর ধরে কাজ করছি আর এই বছর পার হলে প্রায় আট বৎসর হয়ে যাবে। কিন্তু 2020 সালে আমি তেমন একটা কাজ করিনি এবং আমার গিগ রেংকিং খারাপ অবস্থায় আছে।
আমার একটি এজেন্সি আছে হয়তোবা অনেকেই জানেন, আমি ডিরেক্ট ক্লায়েন্টের সাথে যোগাযোগ করে কাজ করি মার্কেটপ্লেসের বাহিরে মার্কেটপ্লেসের উপর নির্ভরশীল হতে হয় না কিন্তু মার্কেটপ্লেস খুবই সহজ একটি মাধ্যম যেখানে আপনি কোন রিলেশনশিপ বিল্ডাপ না করে কাজ পেয়ে যাচ্ছেন।
মার্কেট প্লেসের বাহিরে আপনাকে একটি ক্লায়েন্ট তৈরি করার জন্য অনেক সময় তিন থেকে ছয় মাস তার সাথে শুধু রিলেশনশিপ তৈরি করে তারপর কাজ পেতে হবে কিন্তু মার্কেটপ্লেস আপনি খুব সহজেই কাজ পেয়ে যান।
যখন আপনি মার্কেটপ্লেসের বাহিরে ক্লায়েন্ট অর্জন করতে চাইবেন তখন আপনাকে এই উপরের প্রবলেমগুলো শিখে বুঝে এবং তারপর তার সাথে কথা বলতে হবে আর তখন বুঝতে পারবেন এই বুদ্ধিগুলো যদি আপনি আগেই ফাইবারের ব্যবহার করেন তাহলে খুব সহজেই কাজ পেয়ে যাবেন।
আমি বাহির থেকে যদি 2 হাজার ডলারের কাজ পাই প্রতিমাসে তাহলে অন্তত ফাইবারে দু-একটা গিগ এডিট করে আমি প্রতিমাসে 500 থেকে 1000 ডলারের কাজ ফাইবারে পেয়ে থাকি কোন প্রকার ঝামেলা ছাড়াই। বাহিরে ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করার কারণে ফাইবারের তেমন একটা কাজ করার সুযোগ পাইনা তাই ইনকামটা ওই বছর কম হয়েছে ফাইবার থেকে।
তাই সব সময় মার্কেটপ্লেসে নিজের প্রোফাইল টা ভালো করে বিল্ডআপ করবেন এবং তারপর চেষ্টা করবেন মার্কেটপ্লেসে নির্ভরশীল না থেকে নিজের একটি জায়গা তৈরি করা যেখানে মানুষ আপনাকে নাম বললেই চিনে ফেলবে।
আমি একটি ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে ভিডিও সিরিজ তৈরি করেছি princechowdhury.me যেখানে একদম নতুনদের জন্য অথবা যারা মার্কেটপ্লেসে কাজ পাননি তাদের জন্য একটি রোডম্যাপ হয়ে কাজ করবে এবং রয়েছে কিভাবে ফাইভারে অ্যাকাউন্ট তৈরি করে গিগ বানানো উচিৎ।
নেক্সট পোস্ট হবে ফাইভার এর ওভারঅল রিসার্চ নিয়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *